ইসলামিক ব্যাংকিং-একটি উত্তম অর্থনৈতিক বিকল্প ::: ---লিংকন ভদ্র
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সুষ্ঠু ও প্রকৃত বাস্তবায়ন। ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআনে সুদ গ্রহণ ও প্রদান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার পরিবর্তে মুনাফা ভাগাভাগি, ঝুঁকি বণ্টন এবং বাস্তব সম্পদভিত্তিক বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিচালিত ইসলামিক ব্যাংকিং একটি বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইসলামিক ব্যাংকিং এমন একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যেখানে সুদের পরিবর্তে অংশীদারিত্ব ও মুনাফা বণ্টনের ভিত্তিতে আমানত গ্রহণ এবং বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এখানে ব্যাংক কেবল ঋণদাতা নয়, বরং ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবেও কাজ করে। উৎপাদনশীল ও বৈধ খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, ব্যবসা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
তবে প্রশ্ন আসে—বিনিয়োগ করা টাকা সহজে আদায় করা সম্ভব হবে কি? বাস্তবতা হলো, শতভাগ নিশ্চয়তা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ ব্যবসায় লাভ-ক্ষতি উভয়ই থাকতে পারে। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে সফলতার হার অনেকাংশে বৃদ্ধি করা যায়। সঠিক প্রকল্প নির্বাচন ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ সফল হতে পারে। কিছু গ্রাহক ক্ষতির সম্মুখীন হলেও সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি লাভবান হবে।
এই ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগ্য, দক্ষ ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ। ইসলামিক ব্যাংকিং শুধু অফিসে বসে পরিচালনা করা সম্ভব নয়; এর জন্য মাঠপর্যায়ে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। গ্রাহকের ব্যবসা, প্রকল্প ও বাস্তব অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যারা পরিশ্রম করতে অনিচ্ছুক, তাদের জন্য এ খাত উপযুক্ত নয়। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে বেকারত্বের হার অনেক বেশি, সেখানে পরিশ্রমী জনশক্তির অভাব হওয়ার কথা নয়।
অন্যদিকে সৎ ও দায়িত্বশীল গ্রাহক নির্বাচনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালো গ্রাহক খুঁজে পাওয়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। মনোবিজ্ঞান, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সঠিক তথ্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে একজন উপযুক্ত গ্রাহক নির্বাচন করা সম্ভব। আমার অভিজ্ঞতার আলোকে, প্রতি গ্রামে অন্তত ৫–১০ জন ভালো ও বিশ্বস্ত গ্রাহক পাওয়া যেতে পারে। যদিও ভালো মানুষ মানেই ভালো ব্যবসায়ী নয়, তবে সে ক্ষেত্রে ব্যাংকের দক্ষ কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়ে তাদের সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।
এছাড়া লাভ-ক্ষতির সঠিক হিসাব নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিছু অসৎ গ্রাহক তথ্য গোপন করতে পারে। তাই নিয়মিত তদারকি, হিসাব যাচাই এবং মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের মূল ভিত্তিই হলো বিশ্বাস, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।
এই ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন শরিয়া বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন। এই বোর্ড ব্যাংকের সকল কার্যক্রম শরিয়াসম্মত হচ্ছে কি না তা তদারকি করবে। তবে বোর্ড নিজেই যাতে দুর্নীতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য বছরে একাধিকবার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরীক্ষা পরিচালনা করতে হবে এবং নিরীক্ষার আপত্তিসমূহ দ্রুত সমাধান করতে হবে।
বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলিম হওয়ায় ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শুধুমাত্র ধর্মীয় আবেগের উপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রাথমিক পর্যায়ে জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য সরকারের সমর্থন প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে শতভাগ গ্যারান্টি দিতে হতে পারে। এর মাধ্যমে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং সরকারও জনগণের সমর্থন লাভ করবে।
বর্তমানে দেশে অনেক ইসলামিক ব্যাংক থাকলেও, সাধারণ মানুষের একটি অংশ মনে করে সেগুলোর অনেক কার্যক্রম পুরোপুরি শরিয়াসম্মত নয়। তাই প্রকৃত ইসলামিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু নাম নয়, বরং নীতি, পরিচালনা, বিনিয়োগ ও তদারকির প্রতিটি ধাপে ইসলামের আদর্শ বাস্তবায়ন করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল, সৎ গ্রাহক নির্বাচন, কঠোর তদারকি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রকৃত ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং নৈতিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে।

No comments